হরতাল-অবরোধে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির মুখে পর্যটনশিল্প

0

আলোরপথ২৪.কম

কক্সবাজারে সমুদ্র দেখে ফেরার সময় গত সোমবার গভীর রাতে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে বাসে দুর্বৃত্তদের পেট্রলবোমা হামলার শিকার হয়ে সাতটি প্রাণের যে নির্মম মৃত্যু মানুষ দেখেছে, তাতে দেশি পর্যটকরাও নিরাপত্তাহীনতার কারণে ভ্রমণবিমুখ হবে। এ খাতের সংশ্লিষ্টরা দেশি-বিদেশি পর্যটক হারিয়ে এখন পর্যটনশিল্পের শেষ সম্ভাবনাটুকুও নিভে যাওয়ার আশঙ্কা করছে। তারা বলেছে, গত এক মাসের টানা অবরোধ ও মাঝেমধ্যেই হরতালে এরই মধ্যে পর্যটনশিল্পে ছয় হাজার কোটি টাকার ব্যবসায়িক ক্ষতি হয়েছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির মুখে পড়বে পর্যটনশিল্প; বেকার হবে বহু মানুষ; আটকে যাবে কয়েক হাজার কোটি টাকার ব্যাংক ঋণ।

পর্যটন ব্যবসায়ীরা জানান, ২০১৩ সালের ক্ষতি তাঁরা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি। ডিসেম্বরে শুরু হওয়া ভরা মৌসুমকে সামনে রেখে ক্ষতি পোষানোর স্বপ্ন দেখেছিল ট্যুর অপারেটর ও হোটেল-মোটেল ব্যবসায়ীরা। কিন্তু ৫ জানুয়ারির পর থেকেই স্বপ্ন ম্লান হওয়া শুরু করে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের ডাকা হরতাল-অবরোধে কক্সবাজার, টেকনাফ, সেন্ট মার্টিনসে বহু পর্যটক আটকা পড়ে। তার পর থেকে শুধুই অপেক্ষা। দেশের প্রধান পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে মাস পেরিয়ে গেলেও মৌসুমের চাঞ্চল্য আর ফেরেনি ।

ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (টোয়াব) জানায়, পর্যটন মৌসুমে স্বাভাবিক সময়ে দেশের ভেতরে ৪০ থেকে ৫০ লাখ পর্যটক বিভিন্ন স্থান ভ্রমণ করে। কিন্তু সহিংস রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অভ্যন্তরীণ পর্যটনও বন্ধ হয়ে গেছে। কক্সবাজার, সুন্দরবন, পাহাড়পুর, পার্বত্য চট্টগ্রাম, সিলেট, কুয়াকাটা, নিঝুম দ্বীপ, সেন্ট মার্টিনসসহ কোথাও কোনো পর্যটক নেই। ফলে এ খাতের সঙ্গে জড়িত অন্তত প্রায় অর্ধকোটি মানুষও চরম সংকটে পড়েছে। কর্মী ছাঁটাই এখন দৈনন্দিন বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে  ট্যুর অপারেটর ও হোটেল-মোটেল মালিকদের কাছে ।

টোয়াবের পরিচালক তৌফিক রহমান বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি, ভারতসহ আরো কয়েকটি দেশ থেকে আমার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বেশ কিছু পর্যটক আসার কথা ছিল। তারা ভিসা নিয়ে বসে আছে, আসতে পারছে না। আগামী ১৭ ফেব্রুয়ারিতে ইতালি থেকে ১৭ জনের একটি পর্যটক দল সুন্দরবন, কুষ্টিয়া, রাজশাহী, শ্রীমঙ্গল ও কক্সবাজার ভ্রমণের কথা থাকলেও তারা আসছে না। শুধু একটি গ্রুপ হারিয়েই আমরা ৩৫ লাখ টাকা থেকে বঞ্চিত হয়েছি। ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অনেক ভ্রমণ কর্মসূচি বাতিল হয়ে গেছে।’ ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজমের সঙ্গে হোটেল-মোটেলসহ সব মিলিয়ে দিনে ২০০ কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। ঢাকা চেম্বারের দেওয়া তথ্যেও প্রতিদিন এ ক্ষতির কথা বলা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘এই সময় সাত হাজার বিদেশি পর্যটক আসে। এবার তা না হওয়ায় এটার ক্ষতি ১০০ কোটি টাকা হবে। একটি বিদেশি কম্পানির সঙ্গে দুই বছর ধরে কাজ করে এসব পর্যটক আমরা পেয়েছি। আমাদের কষ্টের ফসল এভাবে নষ্ট হতে পারে না। এ শিল্পের সাময়িক যে ক্ষতি তা হয়ে গেছে। কিন্তু তার চেয়েও বড় ক্ষতি হবে দীর্ঘ মেয়াদে। আমাদের পরবর্তী সিজন শুরু হবে সেপ্টেম্বরে। যে পর্যটকরা এখানে আসার কথা ছিল তাদের আমরা কি সেপ্টেম্বরে আনতে পারব? তাদের মধ্যে সেই আস্থাটা আমরা তৈরি করতে পারব? তাদের কাছে বিকল্প দেশ কি নেই? অন্তত দেশের অর্থনীতির স্বার্থে পর্যটনশিল্পকে হরতাল-অবরোধের বাইরে নিয়ে আসা উচিত। এ অবস্থায় আমাদের রাস্তায় নামা ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না।’

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) পর্যটন খাতে এক দিনে প্রায় ২০০ কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে বলে সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছে । ট্যুরিজম ডেভেলপার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশও একই পরিমাণ ক্ষতির কথা জানিয়েছে। পর্যটন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এক দিনের হরতাল-অবরোধে পর্যটন খাতের যে ২০০ কোটি টাকা ক্ষতি, তার মধ্যে হোটেল-রিসোর্টের এক দিনের ক্ষতিই প্রায় ৫০ কোটি টাকা। সেই হিসেবে গত এক মাসে পর্যটন খাতে ক্ষতির পরিমাণ ছয় হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।

পর্যটনশিল্পে স্থবিরতা নেমে এসেছে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অবরোধের কারণে  উল্লেখ করে ডিসিসিআইয়ের সভাপতি হোসেন খালেদ বলেন, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় যে ইমেজ সংকট হচ্ছে, তা টাকার অঙ্কে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন ফর ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্টের (বিএফটিডি) নির্বাহী পরিচালক রেজাউল একরাম বলেন, ‘এখন পর্যন্ত যে পরিমাণ ট্যুর বাতিল হয়েছে, তাতে আমাদের এই সিজন নিয়ে আশা-ভরসা সব শেষ। এখন ডানা ভাঙা পাখির মতো পর্যটনশিল্পের অবস্থা । সেই ডানা ভাঙা পাখিকে উড়তেই দিচ্ছে না একের পর এক বিভিন্ন  বাধা। এই খাতকে বাঁচাতে হলে পর্যটন খাতকে সব কিছুর উর্ধ্বে রাখতে হবে।’ পর্যটনের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, “সারা বিশ্বে যত কিছুই হোক, পর্যটকদের ওপর কেউ হাত দেয় না। যখন নেপালে মাওবাদীরা প্রচণ্ড গণ্ডগোল করছে তখনো আমি নেপালে গিয়েছি। আমাদের গাড়ি থামিয়ে যখন তারা জানাতে পারে আমরা ট্যুরিস্ট তখন তারা সঙ্গে সঙ্গে ‘সু স্বাগতম, সু স্বাগতম’ বলে আমাদের অভ্যর্থনা জানায়। মাওবাদীরাও বোঝে একটা দেশের অর্থনীতিতে পর্যটন খাতের গুরুত্ব কত।

বিএফটিডির নির্বাহী পরিচালক আরো বলেন, ‘পর্যটন খাত অনেকটা এতিমের মতো চলছে। এই দুরবস্থার মধ্যে সরকারের কেউ এ খাত নিয়ে কথা বলছে না। সরকারের পক্ষ থেকে প্রশাসনের কাছে কোনো লিখিত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে আমার জানা নেই। সরকার গার্মেন্টসের গাড়িবহর নিরাপত্তা দিয়ে বন্দরে নিয়ে যাচ্ছে; কিন্তু পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা নেই।’

ট্যুর প্ল্যানারস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুল হক বলেন, ‘জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত আমার প্রতিষ্ঠানে বেশ কিছু পর্যটক গ্রুপ তাদের পূর্বনির্ধারিত ভ্রমণ পরিকল্পনা বাতিল করেছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে টিকে থাকা কঠিন হবে। অবরোধ-হরতালে ট্যুর বাতিল হচ্ছে। আমার ১২টি পর্যটকবাহী গাড়ি বসে আছে। ব্যাংকঋণ পরিশোধ এবং কর্মীদের বেতন দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।’

 

Share.

Comments are closed.