Visit Us On TwitterVisit Us On FacebookVisit Us On GooglePlusVisit Us On PinterestVisit Us On YoutubeVisit Us On Linkedin
Development work

বর্তমান অবস্থা নিয়ে বিশিষ্ট নাগরিকদের জাতীয় সংলাপের উদ্যোগ

0

আলোরপথ২৪.কম

বিশিষ্ট নাগরিকেরা প্রধান দুই রাজনৈতিক শক্তির অনড় অবস্থানের মধ্যেই সংকট নিরসনে একটি জাতীয় সংলাপের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন । তাঁরা জানিয়েছেন, বর্তমান সংঘাতপূর্ণ অবস্থার উত্তরণ ছাড়াও দেশে যাতে স্থায়ীভাবে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ বজায় থাকে, সব দলের জন্য পালনীয় এমন একটি জাতীয় সনদ (ন্যাশনাল চার্টার) তৈরি করাও এ সংলাপের প্রধান আলোচ্য বিষয় করা হবে।
গতকাল শনিবার এক গোলটেবিল আলোচনায়,বিএনপির সঙ্গে কোনো আলোচনা হবে না বলে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানোর পর এ উদ্যোগের কথা জানানো হয়। জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের সেমিনার কক্ষে ‘জাতীয় সংকট নিরসনে জাতীয় সংলাপ’ শীর্ষক এ আলোচনার আয়োজন করে ।
এতে সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ টি এম শামসুল হুদা বলেন, পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ রূপ নিয়েছে যে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়েও দুশ্চিন্তার কারণ সৃষ্টি হয়েছে। এক পক্ষ আরেক পক্ষকে নিঃশেষ করে দিতে চাইছে। এই অবস্থায় শুধু বর্তমান পরিস্থিতির নিরসন নয়, ভবিষ্যতের জন্য স্থিতিশীল রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনের জন্য একটি জাতীয় সনদ প্রণয়ন করা দরকার।
আলোচনায় বলা হয়, প্রস্তাবিত জাতীয় সনদে চলমান সংকট নিরসনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলের সঙ্গে আলোচনার দিনক্ষণ নির্ধারণের জন্য সরকারের প্রতি এবং অবরোধ-হরতাল ও পেট্রলবোমা মেরে মানুষ হত্যা বন্ধে বিএনপির প্রতি আহ্বান থাকতে পারে। পাশাপাশি যুদ্ধাপরাধী ছাড়া সব রাজবন্দীর মুক্তি, ছয় মাস রাজপথে কোনো কর্মসূচি না দেওয়া এবং এই সময়ের মধ্যে সংকট নিরসনের পন্থা উদ্ভাবনের চেষ্টা অব্যাহত রাখার বিষয় অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
অবশ্য এর আগে জাতিসংঘ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মহল সহিংসতা পরিহার ও আলোচনার মাধ্যমে আহ্বান জানালেও তাতে কোনো সাড়া মেলেনি সংকট নিরসনে । সংলাপ ও সমঝোতার মাধ্যমে নতুন করে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দাবিতে ২০-দলীয় জোটের টানা কর্মসূচিতে নৃশংস প্রাণহানি যেমন অব্যাহত রয়েছে, সরকারও বিষয়টিকে আইনশৃঙ্খলাজনিত সমস্যা হিসেবে দেখিয়ে বলপ্রয়োগের নীতি গ্রহণ করেছে। সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতি আরও প্রকট হয়ে উঠছে দুই পক্ষের অনড় অবস্থানে ।
দেশের কিছু বিশিষ্ট নাগরিক এমন শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে জাতীয় সংলাপের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানালেন। গতকালের গোলটেবিল আলোচনার প্রথম অধিবেশনে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দিন খান ও দ্বিতীয় অধিবেশনে এ টি এম শামসুল হুদা সভাপতিত্ব করেন।
হাফিজউদ্দিন খান বলেন, একটি ঘোষণা দিয়ে বসে থাকলে হবে না। সংকট নিরসনে নাগরিকদের পক্ষ থেকে চাপ সৃষ্টি করতে হবে। কর্মসূচি দিতে হবে যাতে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সমাধান সম্ভব হয়।
এই আলোচনার অন্যতম প্রধান উদ্যোক্তা বিশিষ্ট আইনজীবী ড. কামাল হোসেন সূচনা বক্তব্যে বলেন, দেশের সামনে আজ এক বিশেষ চ্যালেঞ্জ। দেশের মালিক হচ্ছে জনগণ। অথচ রুগ্ণ রাজনীতির আগুন তাদেরই জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে মারছে। এই অবস্থার নিরসনে নাগরিকদের এগিয়ে আসতে হবে। সেই লক্ষ্যে সম্পূর্ণ নাগরিক উদ্যোগে আলোচনার মাধ্যমে করণীয় নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আইনজীবী শাহদীন মালিকের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত প্রথম অধিবেশনে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা আকবর আলি খান বলেন, প্রধান দুই জোটের মধ্যে লড়াইয়ের ভিত্তিই অবাস্তব। তা হলো দুই জোটের জনসমর্থন প্রায় সমান হলেও একে অপরকে নিশ্চিহ্ন করতে চায়। এর চটজলদি সমাধান নেই। এই অবস্থায় সংলাপও সম্ভব নয়। বিভক্ত সুশীল সমাজের পক্ষে এই সমস্যা সমাধানে ভূমিকা রাখা কঠিন। তবে ঐক্যবদ্ধ হলে সুশীল সমাজের পক্ষে সংকট নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব হতে পারে।
আকবর আলি খানের মতে, সংকট নিরসনে ধাপে ধাপে অগ্রসর হতে হবে। প্রথম এক সপ্তাহ দুই জোট পরস্পরকে গালিগালাজ করা বন্ধ রাখুক। তারপর পেট্রলবোমা ও ক্রসফায়ার বন্ধ হোক। এরপর কী নিয়ে আলোচনা করা যায়, সেই কথাবার্তা শুরু হোক।

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক মো. নুরুল হুদা বলেন, বাংলাদেশ ‘বিনাশী বিভাজনের’ দেশে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে প্রতিপক্ষ বিবেচনা করে একেবারে শেষ করে দেওয়ার সংস্কৃতি চলে এসেছে। এক দল পেট্রলবোমায় মানুষ পুড়িয়ে সরকারকে সংলাপে বসাতে চাইছে। অন্য দল ক্রসফায়ার করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে চাইছে। এই বিভক্তি কেন এবং এর স্থায়ী নিরসন কীভাবে সম্ভব—সেটাই হওয়া উচিত মূল ভাবনার বিষয়।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আরেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, ‘সংকট নিরসনের শত শত উপায় বলে দেওয়া যায়। কিন্তু তাঁরা কি তা শুনবেন? আজ যারা মারা যাচ্ছে, তারাও যে আমাদের মানুষ—এই ভাবনা কবে আসবে রাজনীতিকদের মধ্যে। এখনো তাঁরা দোষারোপের সংস্কৃতির মধ্যে পড়ে আছেন।’ তিনি বলেন, মানুষ বিভাজন চায় না। বিভাজন সৃষ্টি করেছেন রাজনীতিকেরা। সমাধান করাও তাঁদেরই দায়িত্ব।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বিভক্তির কারণ খুঁজে বের করতে হবে। সমস্যা রাজনৈতিক। রাজনৈতিক সমাধানই সফল হতে পারে। কাউকে নিঃশেষ করে দেওয়ার নীতি দুই দলের কারও ক্ষেত্রেই সফল হবে না।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সি এম শফি সামি বলেন, সবাই গণতন্ত্রের কথা বলেন। কিন্তু কারও মধ্যে সহনশীলতা নেই। নৈতিক অধঃপতন ও বুদ্ধির বিকৃতি না ঘটলে কোনো মানুষ অন্য কাউকে পেট্রলবোমা মেরে জ্বালিয়ে দিতে পারে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক রেজা কিবরিয়া বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সরকারেরই দায়িত্ব বেশি। শুধু দমন করার ক্ষেত্রে নয়, সমাধানের ক্ষেত্রেও। এ ছাড়া যাঁরা কোনো বিশেষ গোষ্ঠী বা দলের কথা ভাবেন না, তাঁরা একটা উদ্যোগ নিতে পারেন।

সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানের পথ আলাপ-আলোচনা। কিন্তু সেই পরিবেশ এখন নেই। সংকট যেটুকু চোখে দেখা যাচ্ছে, বাস্তবে তার চেয়ে অনেক গভীর। এই অবস্থায় রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে রাষ্ট্রপতি এগিয়ে আসতে পারেন। তাঁর সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা না থাকলেও ‘সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি’ আছে।
সুজনের সম্পাদকের মতে, নাগরিকদের পক্ষ থেকে সংকট নিরসনের লক্ষ্যে একটি জাতীয় সনদ প্রণয়ন করা যেতে পারে। তাতে নির্বাচনকালীন সরকারপদ্ধতি, নির্বাচনী আইনকানুন, নির্বাচন কমিশনসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার, দ্রুততম সময়ের মধ্যে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং আরও কতিপয় সাংবিধানিক সংস্কারের বিষয় থাকতে হবে।
নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না একটি ঘোষণা পাঠ করেন। তাতে বলা হয়, জাতীয় ঐকমত্য সৃষ্টির লক্ষ্যে আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনা, বিভিন্ন পর্যায়ে সংলাপ ও মতবিনিময়ের মাধ্যমে দেশবাসী ঐক্যবদ্ধ হয়ে সংকটের স্থায়ী সমাধানে বিশেষ অবদান রাখবে।
আলোচনায় আরও অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, সিপিবির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, বিকল্পধারার মহাসচিব আবদুল মান্নান, জেএসডির আ স ম আবদুর রব, গণফোরামের মোস্তফা মহসিন, ডাকসুর সাবেক সহসভাপতি সুলতান মো. মনসুর আহমেদ ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোস্তাক হোসেন, আইনজীবী সুব্রত চৌধুরী, এম কে রহমান, শিক্ষক রোবায়েত ফেরদৌস, প্রযুক্তিবিদ হাবিবুল্লাহ্ করিম প্রমুখ।
প্রস্তাবিত জাতীয় সনদ তৈরি করে কবে নাগাদ কার্যক্রম শুরু হবে—এ বিষয়ে জানতে চাইলে এ টি এম শামসুল হুদা আলোচনা শেষে বলেন, ‘জাতীয় সনদ তৈরির কাজ চলছে। একটি গ্রুপ সেটি নিয়ে ব্যস্ত থাকায় আলোচনা অনুষ্ঠানে আসেনি। এই আলোচনা থেকে উঠে আসা প্রস্তাবনাও যুক্ত করে নীতিমালাটি দু-তিন দিনের মধ্যে তৈরি সম্ভব হবে।’

 

Share.

Comments are closed.