কলাপাড়ায় ক্ষোভে ফুসছে তিনটি মৌজার সহস্রাধিক পরিবারের মানুষ

0

আলোরপথ টোয়েন্টিফোর ডটকমঃ

সুজন মৃধা, কলাপাড়া প্রতিনিধি

পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার ধানখালীতে ১৩২০ মেগাওয়াট তাপ বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণের লক্ষ্যে গত ৩ মার্চ জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির(একনেক) সভায় ৭৮২কোটি ৬২ লাখ টাকা অনুমোদ দিয়েছেগ। ভূমি মালিকদের দাবী-দাওয়া, স্বার্থ, মানবিক দিক গুলো বিবেচনায় না এনে এবং ভুমি অধিগ্রহনের জটিলতা নিরসন না করে বিদ্যুত প্রকল্প বাস্তবায়নের এই উদ্যেগে ক্ষোভে ফুসে উঠেছে প্রস্তাবিত প্রকল্প এলাকার তিনটি মৌজার সাতটি গ্রাম এছাড়াও গোটা ইউনিয়নের হাজারো পরিবারের কয়েক হাজার মানুষ।

উপজেলার ধানখালী ইউনিয়নের মধুপাড়া, নিশানবাড়িয়া ও চরনিশান বাড়িয়া মৌজার এক হাজার একর জমিতে নর্থওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি এবং চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট এন্ড এক্সপোর্ট কর্পোরেশন (সিএমসি) বাংলাদেশ এবং চীনের যৌথ উদ্যোগে এই বিদ্যুত কেন্দ্রটি নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়। দুই বিলিয়ন ডলারের বিদ্যুত প্রকল্পটিতে বাংলদেশ এবং চীন যৌথভাবে বিনিয়োগ করবে। ২০১৪ সালের ২১ মার্চ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়।

ফলে এসব মৌজার মানুষরা শুরু থেকেই বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। তারা প্রতিবাদ সমাবেশ সহ আন্দেলনের ডাক দেয়। এমনকি তিনটি মৌজার সাতটি গ্রাম ছাড়াও গোটা ইউনিয়নের হাজারো পরিবার গোপনে গোপনে আন্দোলনের চুড়ান্ত পদক্ষেপ ও আইনগত ভাবে এই প্রক্রিয়া বন্দের জন্য কাজ করছে। আন্দোলন প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবে এলাকার বাসিন্দারা বিদ্যুত কেন্দ্র অন্যত্র সরিয়ে নেয়া কিংবা অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ায় বাস্তব সম্মত পদক্ষেপ নেয়ার দাবিতে সহস্রাধিক পরিবারের সদস্যরা ২০১৪ সালের ৩১ মে মধুপাড়ায় মানবন্ধন ও বিক্ষোভ-সমাবেশ করে। একই দাবিতে ২০১৪ সালের ১৫ অক্টোবর মানববন্ধন ও সমাবেশ কর্মসূচির জন্য হাজারো মানুষ পুনরায় একত্রিত হলে পুলিশি বাধায় পন্ড করে দেয়া হয়েছে। বর্তমানে প্রশাসন ও স্থানীয় ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের কড়া নজরদারিতে রয়েছে আন্দোলনকারীরা।

বিদ্যুত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের অংশ হিসাবে অতি সম্প্রতি পটুয়াখালী জেলা ভূমি অধিগ্রহণ শাখার একটি টিম তিনটি মৌজার জমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত মাঠ পর্যায়ের পরিমাপ কাজ শেষ করেছে। জেলা ও ভূমি প্রশাসনসুত্রে  জানা গেছে, চরনিশান বাড়িয়া গ্রামের ঘনবসতিপুর্ণ দরিদ্র মানুষের আবাস্থল যতটুকু সম্ভব বাদ দিয়ে অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ার পরিকল্পনা চলছে। সবচেয়ে কম সংখ্যক বসতভিটা অধিগ্রহণের আওতায় রাখা যায় এসব চিন্তা মাথায় রেখে কর্যক্রম চলছে। তবে সাধারণ কৃষক শ্রেণীর মানুষ বলছেন, তাদের ভিটেবাড়িসহ চাষাবাদের জমি হারিয়ে অন্যত্র গিয়ে বসবাসের মতো ক্ষতিপুরণ দেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হোক। এসবের বিশ্বাসযোগ্য প্রতিশ্রম্নতি চান তারা। এক্ষেত্রে তারা সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কাছে আকুতি জানিয়েছেন।

এলাকার বাসিন্দা আঃ সোবাহান বেশ অক্ষেপ করেই বলেন, সাধারনত তাপ বিদ্যুত কেন্দ্র বসতিহীন চর এলাকায় করা হয়। কিন্তু এসবের তোয়াক্কা না করে হাজারো পরিবাকে উদ্বাস্তু করে প্রকল্প বাসত্মবায়নে সরকার যে মূল্যে তাদের জমির জন্য দিচ্ছে তা না দিলেও চলবে। তার চেয়ে বলে দেওয়া ভাল তোমাদের মত প্রজা আমাদের রাষ্ট্রে প্রয়োজন নেই।

এসব মৌজার কৃষকসহ সাধারণ মানুষ জানান, যেসব জমি অধিগ্রহণ করা হবে তা থেকে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে অন্যত্র গিয়ে কোনভাবেই তাদের পুনর্বাসন কিংবা বসবাস করা সম্ভব নয়। কারণ এ তিনটি মৌজার জমির দাম সবচেয়ে কম। আর অন্যত্র জমির দাম চার/পাঁচ গুন বেশি। তাই বর্তমান মূল্যের অনত্মত পাঁচগুন বেশি অর্থ ক্ষতিপুরণ না দেয়া হলে তারা নিঃস্ব হয়ে যাবেন। তারা এনিয়ে জেলা প্রশাসন থেকে শুরু করে সকল পর্যায় দেনদরবার করতে থাকে। কিন্তু প্রশাসন থেকে শুরু করে কারও পক্ষ থেকে সম্ভাব্য অধিগ্রহণকৃত তিনটি মৌজার কৃষকরা কোন ধরনের বিশ্বাসযোগ্য আশ্বাস না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়েন। কারণ পায়রা তৃতীয় সমুদ্র বন্দর, শের-ই-বাংলা নৌ-ঘাটিসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকান্ডে আশপাশের ইউনিয়নের জমির দাম মুর্হুতেই ১০গুন পর্যন্ত বেড়ে গেছে। তাই এসব পরিবারে সদস্যদের মাঝে বাড়িঘর, জমিজমা হারানোর এক ধরনের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

দরিদ্র আবুল হোসেন জানান, তারা মেঘনা নদীর ভাঙ্গন কবলিত এলাকা ছেড়ে প্রায় ৭০ বছর আগে চরনিশান বাড়িয়া গ্রামে বসতি নেন। সরকারিভাবে তাদের বসতির জন্য পরিবার প্রতি পাঁচ একর জমি বন্দোবস্ত দেয়া হয়। এ জমিতে আবার ষাটের দশকে বেড়িবাঁধ করা হয়েছে। এখন প্রায় দু’শ পরিবার বসবাস করছে। তাদের এ জমি ছাড়া আর কোন সহায় নেই। সময়ের পরিক্রমায় পরিবারের সদস্যদের মাঝে এই জমি ভাগ হয়ে যতটুকু রযেছে তা অধিগ্রহণ করলে ভিটেছাড়া হয়ে যাবেন। তার দাবি প্রধানমন্ত্রীকে এসংক্রান্ত সঠিত তথ্য জানানো হয় নি। তাদের বিশ্বাস প্রধানমন্ত্রী জানতে পারলে তাদের জীবন-জীবিকা সমস্যার সমাধান করতেন।

এলাকার বাসিন্দা সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান, প্রবীণ আইনজীবি জালাল তালুকদার জানান, উপরোক্ত তিনটি মৌজা নদী ভাঙ্গন এলাকায়, তাই জমির দাম সবচেয়ে কম। এছাড়া বেচাকেনার ক্ষেত্রে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেয়ার মানসিকতায় ইতোপূর্বে সম্পাদিত দলিলে জমির প্রকৃত দাম উলেস্নখ নেই। ফলে তিনটি মৌজার অন্তত এক হাজার পরিবার অধিগ্রহণ মূল্য নির্ধারণ নিয়ে বড় ধরনের শঙ্কায় পড়েছেন। বাপ-দাদার ভিটে, চাষের জমি ছেড়ে অন্যত্র গিয়ে একটি বসতবাড়িসহ ওই পরিমাণ কৃষি জমি কেনার মতো ক্ষতিপুরণ না পেলে মানুষের আন্দোলন ছাড়া করার কী আছে।

পটুয়াখালী জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তিনটি মৌজার কৃষকের সমস্যার সমাধানে বাস্তব সম্মত পদক্ষেপ এবং যথাযথভাবে পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এপ্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। এমনকি মাঠ পর্যায়ে ক্যাম্প করে ক্ষতিপুরন নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে। আরো জানানো হয়, পরিবেশ-প্রতিবেশ এর ক্ষতির কোন কারণ নেই। উল্টো পরিবেশের সহায়ক হিসাবে বিদ্যুত কেন্দ্রের আশপাশে গ্রিণ এনার্জি সিটি করার পরিকল্পনা রয়েছে। লাখ লাখ বৃক্ষের বনাঞ্চল করা হবে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সকল ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হবে।

 

Share.

Comments are closed.